সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে চালু হওয়া ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দোহাটেক নিউ মিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক এ কে এম সামসুদ্দোহা এই প্রভাব বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) বা সাবেক সিপিটিইউর অধীনে পরিচালিত ই-জিপি সিস্টেমে প্রায় ১৬ বছর ধরে একই গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, এ কে এম সামসুদ্দোহা ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সালমান এফ রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গেও তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। এসব সম্পর্কের মাধ্যমে প্রভাব বলয় আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ই-জিপি চালুর পর থেকে বড় অংশের সরকারি কাজই এই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদি একক আধিপত্য নিরুৎসাহিত করা হলেও, দোহাটেক নাম পরিবর্তন করে ‘eGP STAR’ হিসেবে একই প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি বিভাগের e-PMIS প্রকল্পে শুরুতে যৌথভাবে কাজ করলেও পরবর্তীতে বেক্সিমকোর নাম বাদ পড়ে দোহাটেক এককভাবে দায়িত্ব পায় এ বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময় শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিতর্কেও এই গোষ্ঠীর নাম আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ই-জিপি সিস্টেমের নিরাপত্তা নিয়ে। একাধিক সূত্রের দাবি, সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ পাসওয়ার্ড ও নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির হাতে থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দরপত্র আগেভাগে জানিয়ে দেওয়া এবং অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সফটওয়্যার উন্নয়নের তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো এবং প্রতিযোগিতা সীমিত করার ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে দোহাটেকের কার্যক্রম শুধু ই-জিপিতেই সীমাবদ্ধ নয়। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা তথ্য ব্যবস্থা, রাজউকের অনলাইন সিস্টেম, আরজেএসসি’র ডিজিটাল কার্যক্রমসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় অংশ একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আগামী ২০২৬ সালের জুনে ই-জিপি প্রকল্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না হলে একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।