মৌসুমের শেষ লগ্নে এসে যখন রেকর্ড উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছিলেন কক্সবাজার উপকূলের লবণচাষিরা, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে নামল বিপদ। ঝড়ো হাওয়া আর মুষলধারে বৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে গেল হাজার হাজার একর লবণমাঠ। একদিকে প্রকৃতির রোষ, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব- দুই দিক থেকে চাপে পড়ে কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন উপকূলের প্রায় ৪২ হাজার চাষি।
তীব্র দাবদাহের সুযোগে কক্সবাজার উপকূলে লবণ উৎপাদন রীতিমতো রেকর্ড ছুঁয়েছিল। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে লাফিয়ে উঠেছিল ৩২ হাজার মেট্রিক টনে। কিন্তু সেই উজ্জ্বল মুহূর্তকে ম্লান করে দিল কালবৈশাখীর দুই দফা আঘাত। বৈশাখের শুরুতে একবার, তারপর মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাতে প্রবল বর্ষণ- এই তিন দফা ধাক্কায় শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের মাইজপাড়ার চাষি কবির আহমদ এ বছর ১২ একর জমিতে লবণ চাষ করেছিলেন। মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে তার প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বড় লোকসানের মুখে পড়েছি।
টেকনাফের সাবরাং এলাকার চাষি আলী আহমদের আক্ষেপ আরও তীব্র। ঋণ করে মাঠ নিয়েছিলেন। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ঋণ করে মাঠ নিয়েছি, কালবৈশাখীতে সব শেষ! এখন কীভাবে ঋণ শোধ করব বুঝতে পারছি না।
টেকনাফের নোয়াপাড়ার চাষি গিয়াস উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে খালের দুই পাশের ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে উৎপাদন থেমে গেছে। শাহপরীর দ্বীপের নুরুল ইসলাম বলেন, রাতদিন পরিশ্রম করে বেশি লাভের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশো মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে।
কুতুবদিয়ার চাষি শহীদুল ইসলামের হিসাব আরও কঠিন। হাতে বাকি মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন। একবার বৃষ্টি হলে ৭ থেকে ৮ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকে। তাই অনেক চাষিই এখন আর মাঠে নামতে চাইছেন না।
বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, সদর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মোট ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন, যা গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কম।
চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। গত সাড়ে পাঁচ মাসে উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন। দেশে লবণের মোট চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
বিসিকের কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, বৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। দৈনিক গড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ধরলে এই ১২ দিনে কম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে মাঠ ও কারখানা পর্যায়ে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে।
মৌসুমের শুরু থেকেই ছিল বিপদ শুধু কালবৈশাখীর আঘাতই নয়, মৌসুমের শুরু থেকেই প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন চাষিরা।
লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে মাঠে নামতে ২০ থেকে ২৫ দিন দেরি হয়েছিল। এখন বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে।
সাহাব উদ্দীন জানান, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে লবণ বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকায়। মার্চের মাঝামাঝিতে সামান্য বেড়ে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা হয়েছে। কিন্তু তার মতে, ন্যায্যমূল্য হিসেবে এটি কমপক্ষে প্রতি মণ ৪০০ টাকা হওয়া উচিত। এর ওপর নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে লবণ আমদানির গুজব।
টেকনাফের চাষি ছলিম উল্লাহ জানান, ৭ ও ৮ এপ্রিলের পর আবার প্রবল বৃষ্টিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পলিথিন গুছিয়ে মাঠ তৈরি করতে গেলেও যেকোনো সময় আবার বৃষ্টি নামার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকৃতির রোষের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্যের সংকট চাষিদের আরও গভীর বিপাকে ফেলেছে।