ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডার হতে যাচ্ছেন মুজতবা খামেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় দেশটির সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা সামনে আসে। সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মুজতবাই হতে পারেন ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার।
বুধবার (৪ মার্চ) সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বা ‘বিপ্লবী গার্ড’-এর সরাসরি চাপে দেশটির নীতিনির্ধারক পরিষদ অ্যাসেমব্লি অব এক্সপার্টস মুজতবাকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে দেশটির পবিত্র নগরী মাশহাদে সমাহিত করা হবে। তিনি ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদের সন্তান ছিলেন। সেখানকার ইমাম রেজা মাজারে তার বাবার কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করার কথা রয়েছে।
কে এই নতুন সুপ্রিম লিডার
৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনি ইরানের শাসন ব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী, কিন্তু আড়ালে থাকা ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মুজতবা বেড়ে ওঠেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের সময়ে। তার বাবা তখনকার প্রভাবশালী আলেম শাহের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বারবার গ্রেপ্তার ও নির্বাসিত হন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর পরিবারের অবস্থান পাল্টে গেলে মুজতবা তেহরানে চলে আসেন। সেখানে তিনি এলিট আলাভি হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। এটি শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তৈরির জন্য পরিচিত। পরে তেহরান ও কুমে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং রক্ষণশীল আলেম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ-তাকি মেসবাহ ইয়াজদিসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির অধীনে পড়াশোনা করেন বলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ইউএএনআই জানিয়েছে।
মুজতবা একজন মধ্যম-স্তরের আলেম, তবে তিনি আয়াতুল্লাহ নন। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম লিডারের দপ্তরে আড়ালে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। বিশ্লেষকরা প্রায়ই তার ভূমিকাকে আহমদ খোমেনির সঙ্গে তুলনা করেন, যিনি তার বাবা রুহুল্লাহ খোমেনির শাসনামলে প্রধান আস্থাভাজন ও গেটকিপার হিসেবে কাজ করেছিলেন।
মুজতবার প্রভাবের পেছনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি হাবিব ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে গোয়েন্দা ও বাসিজ কমান্ডারসহ নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ে ওঠা ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিদেশি সরকারগুলো তাকে নির্বাচন রাজনীতি ও নিরাপত্তা দমনপীড়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় মার্কিন ট্রেজারি জানায়, আলি খামেনি তার কিছু ক্ষমতা ছেলের কাছে ন্যস্ত করেছিলেন এবং নির্বাচিত পদে না থাকলেও তিনি আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করতেন।
তবে তার উত্তরসূরি হওয়া সহজ নয়। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সুপ্রিম লিডার হতে হলে উচ্চপদস্থ ধর্মীয় আলেম এবং স্বীকৃত ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার অধিকারী হতে হয়। মুজতবা বর্তমানে আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা ধারণ করেন না। তা ছাড়া বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাবা থেকে ছেলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর একটি সংবেদনশীল বিষয়।
তারপরও বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, আইআরজিসি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শক্ত অবস্থান তার প্রার্থিতা জোরদার করতে পারে, বিশেষ করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো তার পক্ষে একত্র হলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার ধর্মীয় মর্যাদা বাড়াতে অনানুষ্ঠানিক প্রচারের কথাও শোনা গেছে, যদিও আলেম সমাজের একটি অংশ এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের অ্যাসেমব্লি অব এক্সপার্টসই পরবর্তী সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করে থাকে। সংস্থাটি যোগ্য আলেমদের মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মানদণ্ড পূরণকারী একজনকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সংবিধান প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের ব্যবস্থারও অনুমতি দেয়, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাহী কর্তৃত্ব অব্যাহত থাকে।