সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
এনসিপি শক্তিশালী না হলে ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের পথ সৃষ্টি হবে : সারজিস মেট্রোরেলের লাইনে নেমে পড়ে কিশোর, বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল স্কুলে ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করলো অস্ট্রিয়া সিফাত আব্দুল্লাহর জামিন নামঞ্জুর ইয়ামিন হত্যায় সরকারি খরচে আইনজীবী পাচ্ছেন ১৩ আসামি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে ঠাকুরগাঁও ছাড়লেন রাষ্ট্রপতি ধামইরহাটে দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা মালয়েশিয়ায় অবৈধ বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফেরার আহ্বান হাইকমিশনের তুচ্ছ ঘটনাকে ঘিরে মারামারি, রাবিতে কেন বাড়ছে অসহিষ্ণুতা? আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৮১, গড়ে প্রতিদিন ১৫ জনেরও বেশি

তুচ্ছ ঘটনাকে ঘিরে মারামারি, রাবিতে কেন বাড়ছে অসহিষ্ণুতা?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা মঞ্চে বসে সিগারেট খাচ্ছিলেন এক জুনিয়র শিক্ষার্থী। সেখানে আগে থেকেই বসা ছিলেন কয়েকজন সিনিয়র। জুনিয়র শিক্ষার্থী একপর্যায়ে সিনিয়রদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। সিনিয়ররা ধূমপানে বাধা দিলে শুরু হয় বাদানুবাদ, যা পরে রূপ নেয় বড় ধরনের সংঘর্ষে। গত ২৭ এপ্রিল রোববার রাতে চারুকলা অনুষদের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বর্তমান অস্থির পরিস্থিতির একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ক্যাম্পাসে অন্তত ১০টি বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘটনার পেছনেই ছিল একান্তই ‘তুচ্ছ’ বা সামান্য কারণ। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব , ইফতারের জায়গা দখল, চায়ের দোকানে বসা, ক্রিকেট-ফুটবল খেলা বা হাঁটার সময় ধাক্কা লাগার মতো সাধারণ বিষয়গুলো থেকে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

পিছিয়ে নেই খেলাধুলাও। তবে প্রতিটি ঘটনার পরেই গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। কিন্তু অধিকাংশ তদন্ত প্রতিবেদন শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও বোঝাপড়ার অভাব প্রকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। ফলে এসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতিই আবার শিক্ষার্থীদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।

প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে আইন ও মার্কেটিং বিভাগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন ১৫ জন। ২০২৪ সালে ইফতার করা নিয়ে আইন বিভাগ ও ফাইনান্স বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে সেই পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাস্কেটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটের আমতলা চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট খেলা নিয়ে গণিত বিভাগ এবং ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে এক শিক্ষকসহ প্রায় ২০ শিক্ষার্থী আহত হন।

২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল চারুকলায় বসা নিয়ে বাদানুবাদের জেরে সাধারণ শিক্ষার্থী আবুল হাসানকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ ওঠে ছাত্রদল নেতা হাসিবুর রহমান হাসিবের বিরুদ্ধে। এ বছরের ১৮ জুন র‍্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে প্রক্টর ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই হামলার শিকার হন তিন সাংবাদিক।

গত জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ বড় পর্দায় প্রদর্শনের সময় গোল উদযাপনের জেরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। খেলা শেষে দর্শকদের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে, যেখানে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে।

চলতি মাসের ২৬ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে (টিএসসিসি) একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার এই সংঘর্ষে অন্তত ৪ জন আহত হয়েছেন।

ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা এক শান্ত ও স্থিতিশীল বিশ্ববিদ্যালয় চান। এখন ক্যাম্পাসে চলতে ভয় লাগে। কারো সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হলেও মনে হয় এই বুঝি মারামারি লেগে যাবে। তারা পড়ার পরিবেশে ফিরতে চান।

কেন বাড়ছে এই অসহিষ্ণুতা?

বিশ্ববিদ্যালয়ের জেষ্ঠ্য শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব ও অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ইগোতে লাগা বা ‘বড়ভাই কালচার’ বজায় রাখার প্রবণতা থেকেই এই উগ্রতা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সুস্থ বিনোদনের অভাবও এর অন্যতম কারণ।

মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মুজিবুল হক আজাদ খান বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা ও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে। তবে এ জন্য শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করা যায় না। তিনি বলেন, ‘একজন সিনিয়র বা শিক্ষককে দেখলে উঠে দাঁড়াতে হয়—এ ধরনের সামাজিক আচরণ তাদের শেখানো হয়নি। আমাদের পরিবারেও ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় না যে প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদা মর্যাদা রয়েছে। বরং পরিবার থেকেই ছোট-বড় ভেদাভেদ শেখানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছেলে-মেয়েদের রাজনৈতিকভাবে বেয়াদব বানানো হয়েছে। তাদের শেখানো হয়েছে, তুমি যাকে পছন্দ করো না, তাকে অপমান করো। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের বিষয়ে অধ্যাপক আজাদ খান বলেন, এর প্রতিকার হুট করে সম্ভব নয়। ‘এক দিনে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তাই গোড়া থেকেই এটি ঠিক করতে হবে। পরিবার ও সমাজকে সন্তানদের ধৈর্য ধারণ, অন্যকে সম্মান করা এবং সহনশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা তৈরি করা গেলে মারামারি ও হানাহানি অনেকটাই কমে আসবে বলে আমি মনে করি।’

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102