দিন যত গড়াচ্ছে, ক্রমেই লাগামছাড়া হয়ে উঠছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুতই প্রাক্-শিল্পযুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ‘লিমিটিং ওভারশুট’-এ বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সাময়িকভাবে হলেও পৃথিবীর তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। প্রতিবেদনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারবে না। ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আর কখনোই পুরোপুরি ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় ফিরবে না—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
ইউএনইপির ভারতীয় প্রধান বালকৃষ্ণ পিসুপতি বলেন, বর্তমানে প্রকৃতিতে একই সঙ্গে পাঁচটি জলবায়ু ‘ঘড়ি’ চলছে। এগুলো হলো—উষ্ণতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন এবং মানবজীবনের ওপর প্রভাব। প্রতিটির গতি ও ক্ষতির ধরন ভিন্ন।
তিনি বলেন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও গলে যাওয়া বরফ বা হিমবাহ সহজে আগের অবস্থায় ফিরবে না। এমনকি ১০০ বছর পর বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমে গেলেও ১৮০০ বা ১৯০০ শতকের মতো হিমবাহ ফিরে আসবে না। একইভাবে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা মাত্র ১০ বছরের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় ক্ষতি হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোনো প্রজাতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যেও পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ ছাড়া খরা ও বন্যার মতো দুর্যোগের কারণে ইতোমধ্যে অনেক কৃষককে বসতভিটা ও জমি বিক্রি করে জীবিকা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কয়েক দশকের প্রচেষ্টাতেও তাঁদের আগের জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনগুলোতে।
বালকৃষ্ণ পিসুপতির মতে, দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রযুক্তির অসম ব্যবহারের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে এ অঞ্চলের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে এখানকার উন্নয়নশীল দেশগুলো।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে জলবায়ু সংকটের দায় ও দায়িত্ব ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে ‘কমন বাট ডিফারেনশিয়েটেড রেসপনসিবিলিটিজ অ্যান্ড রেসপেক্টিভ ক্যাপাবিলিটিজ’ (সিবিডিআর-আরসি) বা অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও সক্ষমতার নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতির মূল বক্তব্য হলো—অতীতে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে শিল্পায়ন করা উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বেশি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দায়িত্ব নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দুর্বল ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে উন্নত দেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক ‘কার্বন ঋণ’ পরিশোধে এগিয়ে আসতে হবে বলেও প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু সংকট এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি মানুষের বেঁচে থাকা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই বিশ্বকে সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।