শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১০:০৭ অপরাহ্ন

ডিজিটাল আসক্তি ও মনোযোগহীনতা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

একটু ভেবে দেখুন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্যই দিনে ২৪টি ঘণ্টা বা ৮৬ হাজার ৪০০ সেকেন্ড বরাদ্দ থাকে। কিন্তু দিনশেষে সকলের অর্জন কেন সমান হয় না? এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে মানুষের মস্তিষ্ক এবং তার মনোযোগের কার্যকারিতার মধ্যে। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে, আপনার উইল পাওয়ার যত মজবুত, আপনার মনোযোগ বা ‘এটেনশন ক্যাপিটাল’ তত শক্তিশালী। কিন্তু এই মূল্যবান ক্যাপিটাল বা মূলধন আপনি কোথায় এবং কীভাবে খরচ করছেন, তার ওপরই নির্ভর করে আপনার জীবনের আসল প্রডাক্টিভিটি বা অর্জন।

ধরুন, আপনি একজন সাধারণ ছাত্র। সকালে ঘুম থেকে জেগেই আপনি চিন্তা করতে বসলেন, আজ কোন রঙের শার্টটি পরবেন? নাস্তার টেবিলে গিয়ে ভাবলেন, এত খাবারের মধ্যে আজ কোনটা খাওয়া যায়? বাইরে যাওয়ার সময় কোন জুতোটা পরবেন? আজ বন্ধুদের সাথে কখন দেখা করবেন? দেখতে খুব সাধারণ মনে হলেও, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘মাইক্রো-ডিসিশন’ । প্রতিটি ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আপনার অজান্তেই উইল পাওয়ারের ব্যাটারি থেকে চার্জ অপচয় হতে থাকে। ফলে মূল পড়াশোনায় বসার আগেই আপনার মনোযোগের একটা বড় অংশ হারিয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর বিখ্যাত General Bernard Montgomery -র কথা ধরা যাক। ১৯৪৪ সালে যখন তিনি মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ওভারলর্ড’ এর পরিকল্পনা করছিলেন, তখন সমগ্র ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল তার নিখুঁত সিদ্ধান্তের ওপর। ইউরোপ তার অস্তিত্বের জন্য এই মানুষটির শতভাগ প্রজ্ঞা ও মনোযোগ কেবল  ঐ একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধকৌশলে নিয়োজিত রাখার দরকার ছিল।  কিন্তু জেনারেল মন্টগুমারি যদি সেই মহামূল্যবান সময়ে বসে বাচ্চার স্কুলের ফিস, স্ত্রীর শাড়ির রঙ, নিজের জুতো বা দুপুরের খাবার মেন্যু নিয়ে মাথা ঘামাতেন এবং সেখানে মনোযোগ ব্যয় করতেন, তবে কি তিনি সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ জয় করতে পারতেন?

ঠিক এই কারণেই পৃথিবীর সফল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের মনোযোগ বাঁচানোর জন্য দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তগুলোকে একদম বাদ দিয়ে দেন। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস সবসময় একই ডিজাইনের কালো টার্টলনেক টি-শার্ট এবং জিন্স পরতেন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ প্রতিদিন একই ধূসর রঙের টি-শার্ট পরেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কেবল ধূসর বা নীল রঙের স্যুট পরতেন।

এক সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেছিলেন, “আমি কী খাব বা কী পরব, এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি আমার মনোযোগের অপচয় করতে চাই না।” বড় বড় পদের ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্র যে বিশেষ লোকবল, গাড়ি বা কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়, তা সত্যিই কোন বিলাসের জন্য নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, যাতে তাদের পারিবারিক বা দৈনন্দিন ক্ষুদ্র ঝামেলা নিয়ে মাথা ঘামাতে না হয় এবং রাষ্ট্র যেন তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে পরিপূর্ণভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করতে পারে।

ধরুন, একজন অত্যন্ত ধনী ব্যক্তির একমাত্র সন্তান লিভারের একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। আজ তার জীবন-মরণ নির্ধারণকারী একটি অপারেশন করবেন একজন নামী সার্জন। এমন অবস্থায় সেই বাবা তার ছেলের চিকিৎসকের কাছ থেকে কতটুকু মনোযোগ আশা করবেন? নিশ্চিতভাবেই তিনি শতভাগের চেয়েও বেশি মনোযোগ চাইবেন। তিনি প্রার্থনা করবেন যেন সার্জন আগের রাতে খুব ভালো ঘুমান, তিনি যেন সম্পূর্ণ পারিবারিক ও মানসিক দুশ্চিন্তামুক্ত থাকেন, যাতে অপারেশনের টেবিলে তার মনোযোগ এক চুলও এদিক-ওদিক না হয়।

১% থেকে ১০০% মনোযোগ প্রতিদিন কোন কোন বিষয়ে কতটুকু ব্যয় হচ্ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কতটুকু অবশিষ্ট থাকছে, এটাই হলো ‘এটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগের অর্থনীতি। আপনি হয়তো ভাবছেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করার জন্য আপনাকে কোনো টাকা দিতে হচ্ছে না, তাই এগুলো সম্পূর্ণ ‘ফ্রি’ বা বিনামূল্যে ব্যবহার করছেন।

কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি। সিলিকন ভ্যালির একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে—”If you are not paying for the product, then you are the product.” বড় বড় টেক জায়ান্ট রাজনৈতিক দল এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে আপনার এই ‘মনোযোগ’ বা এটেনশন হিরের চেয়েও দামি। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতি মুহূর্তে আপনার চারপাশকে এবং আপনার ডিজিটাল স্ক্রিনকে এমন অ্যালগরিদম  দিয়ে সাজিয়ে রাখছে, যা আপনার মনস্তত্ত্বকে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করছে।

আপনি কোন পোস্টে কত সেকেন্ড থামছেন, কোন ধরনের ভিডিওতে ক্লিক করছেন, তার নিখুঁত হিসাব রেখে তারা এমন কন্টেন্ট আপনার সামনে হাজির করে, যা আপনাকে স্ক্রিনের সামনে আঠার মতো আটকে রাখে। তাদের মূল লক্ষ্য একটাই, আপনার মনোযোগ কেড়ে নিয়ে সেই মনোযোগকে বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে বিক্রি করা। এটাই মনোযোগের বাণিজ্য। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে বুঝবেন, এটাকে শুধু ‘বাণিজ্য’ বলা হলে  ভুল হবে। বাণিজ্য হয় পারস্পরিক সম্মতিতে এবং যেখানে দুই পক্ষেরই সমান লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকে। কিন্তু এই টেক জায়ান্টরা যা করছে, তাকে এককথায় বলা যায় ‘মনোযোগের সুপরিকল্পিত লুণ্ঠন’।

কেন এটি ডাকাতি? কারণ এই প্রক্রিয়ায় আপনার অবচেতনেই আপনার মস্তিষ্ককে হ্যাক করা হচ্ছে। মনোবিজ্ঞান এবং নিউরোসায়েন্সের সর্বোচ্চ জ্ঞান ব্যবহার করে এই অ্যাপগুলোর নোটিফিকেশন সিস্টেম, লাইক বাটন এবং ‘ইনফিনিট স্ক্রোলিং’ডিজাইন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোনের ক্ষরণ ঘটানো, আর মানুষকে আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়া। জুয়াড়িরা যেভাবে ক্যাসিনোর স্লট মেশিনে আসক্ত হয়ে পড়ে, এটি ঠিক সেভাবেই কাজ করে।

বাজার গবেষণা ও মনস্তাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, একজন আধুনিক শহরের বাসিন্দা প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হন! সকালের খবরের কাগজ, টিভির স্ক্রিন, বাসের গায়ের পোস্টার থেকে শুরু করে ফেসবুকের ফিড, ইউটিউবের ভিডিওর মাঝখানের পপ-আপ, সবখানে শুধু বিজ্ঞাপনের সুনামি। প্রতিটি বিজ্ঞাপন আপনার মনোযোগের দেয়ালে আক্রমন করে চলেছে। এই ক্রমাগত আক্রমণের ফলে আপনার মন হয়ে পড়ছে খণ্ডিত, চিন্তাভাবনা হয়ে যাচ্ছে অগভীর। মানুষ আজ কোনো একটি বইয়ে বা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে একটানা ১০ মিনিটও পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছে না।

আমরা বায়ু দূষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, শব্দ দূষণ নিয়ে আইন করি, আলোক দূষণ নিয়েও কথা বলি। কিন্তু বর্তমান যুগে মানবজাতির সামনে সবচেয়ে নিঃশব্দ ও ভয়ঙ্কর যে চ্যালেঞ্জটি এসে দাঁড়িয়েছে, তা হলো ‘ডেটা পল্যুশন’ বা তথ্য দূষণ। এই তথ্য দূষণ মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বকেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। তরুণ থেকে বৃদ্ধ, শ্রমিক থেকে মালিক, আজ সবাই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে এর সবচেয়ে বড় শিকার  হল শিশুরা। হাজার হাজার শিশুর সাথে কথা বলে দেখা গেছে, আজ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোনো পড়া কঠিন লাগা নয়; বরং তাদের মূল সমস্যা হলো ‘ডিস্ট্রাকশন’।

আপনার অর্থ আপনার সম্পদ; আপনার সময় আপনার অর্থের চেয়েও মূল্যবান। কিন্তু আপনার মনোযোগ আপনার সময়ের চেয়েও হাজার গুণ বেশি দামি ও শক্তিশালী। কারণ মনোযোগ ছাড়া পার হয়ে যাওয়া সময়গুলো শূন্যতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102