বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নারী ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

১৯৩২ সালে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সময় তিনি ১৫ জনের একটি বিপ্লবী দলের নেতৃত্ব দেন। ক্লাবটিতে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।’ প্রীতিলতার দল ক্লাবটি আক্রমণ করে। পরবর্তীতে পুলিশ তাদের আটক করতে গেলে গ্রেপ্তার এড়াতে প্রীতিলতা সায়ানাইড পান করে আত্মহত্যা করেন।

প্রীতিলতা ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং মাতার নাম প্রতিভা দেবী। তিনি ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন এবং পরে ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন।

কলেজের ছাত্রীনিবাসে থাকাকালে তিনি বিপ্লবী লীলা নাগের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘দীপালি সংঘ’-এর সংস্পর্শে আসেন। এটি ছিল ঢাকার একটি বিপ্লবী সংগঠন ‘শ্রীসংঘ’-এর নারী শাখা। ১৯২৯ সালে তিনি এই সংগঠনের সদস্য হন।

এইচএসসি পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই সূর্য সেনের নির্দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি মেয়েদের নিয়ে একটি বিপ্লবী চক্র গড়ে তোলেন এবং অর্থ সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে পাঠাতেন। পাশাপাশি কলকাতার গোপন কারখানায় তৈরি বোমার খোল সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলো বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ সংঘটিত হয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশ শাসন অচল হয়ে পড়ে- টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হয়, রিজার্ভ পুলিশ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়। তখন প্রীতিলতা কলকাতায় ছিলেন। বিএ পরীক্ষা শেষে তিনি স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসেন।

১৯৩২ সালে তিনি চট্টগ্রামের অপর্ণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। একই বছরের মে মাসে তার জন্মস্থান ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে সূর্য সেন ও তার সহযোদ্ধারা গোপন বৈঠক করেন। এ সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে বিপ্লবীদের বন্দুকযুদ্ধ হয়, যেখানে নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন শহিদ হন। সূর্য সেন প্রীতিলতাকে নিয়ে পাশের ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। পরে পুলিশ সাবিত্রী দেবীর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়।

এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার প্রীতিলতাকে সন্দেহ করতে শুরু করলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। অন্য একটি বিপ্লবী দল ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হলে, প্রীতিলতার ওপর এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৩২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত পুরুষের বেশে সেখানে যান। পথে কল্পনা দত্ত ধরা পড়লেও প্রীতিলতা নিরাপদে পৌঁছাতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তার নেতৃত্বে আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং কাট্টলীর সাগরতীরে প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে। আক্রমণের পর নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গ্রেফতার এড়াতে তিনি সঙ্গে থাকা সায়ানাইড পান করে আত্মত্যাগ করেন।

মৃত্যুর আগে তিনি মাকে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘মাগো, অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা শৃঙ্খলাবদ্ধ, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না?’

শুধু তার মা নন, আজও দেশপ্রেমী মানুষ অসাধারণ সাহসী এই নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102