শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন

ইরানের ১০ হাজার কোটি ডলারের জব্দ সম্পদ কী, কোথায় আছে

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের ঘটনায় প্রথমবার ইরানের ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নকে ঘিরে সেই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। এর ফলে তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ের বড় অংশসহ ইরানের বহু অর্থ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে যায়।

১০ এপ্রিল পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনা শুরুর আগেই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত না হলে কোনো আলোচনা শুরু করা উচিত নয়। এরপর ইসলামাবাদে বৈঠক চলাকালে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসন দ্রুতই তা অস্বীকার করে জানায়, ইরানের সম্পদ এখনও জব্দ অবস্থায় রয়েছে। আগামী ২২ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।

ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও দেশটির সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের অনুমান, বিদেশে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ফ্রেডেরিক শ্নাইডার বলেন, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক তেল ও গ্যাস আয়ের প্রায় তিন গুণের সমান।

তার মতে, দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন, অর্থ ছাড় পেলেও এর ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শর্ত আরোপ করতে পারে।

ইরান বর্তমানে আলোচনায় অন্তত ৬০০ কোটি ডলার মুক্ত করার দাবি তুলেছে, যা আস্থা বৃদ্ধির একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অর্থ ছাড় হলেও নানা শর্তের কারণে এর পূর্ণ সুবিধা ইরান পায়নি।

ফ্রোজেন অ্যাসেটস বলতে বোঝায় এমন সম্পদ, যা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের হলেও নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে সাময়িকভাবে ব্যবহার বা স্থানান্তর করা যায় না। সমালোচকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে। ইরান ছাড়াও রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিউবার সম্পদও বিভিন্ন সময় এভাবে জব্দ করা হয়েছে।

ইরানের সম্পদ প্রথম জব্দ করা হয় ১৯৭৯ সালে, যখন মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার কঠোর পদক্ষেপ নেন। ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে কিছু অর্থ ছাড় দেওয়া হলেও এর বিনিময়ে ৫২ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত হয়।

২০১৫ সালে জেসিপিওএ চুক্তির মাধ্যমে ইরান কিছু অর্থ ফেরত পায় এবং তার পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করে। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হলেও পরে নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান আবারও সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ হারায়।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ইরানের অর্থ ছড়িয়ে রয়েছে। ধারণা করা হয়, চীনে প্রায় ২০০০ কোটি ডলার, ভারতে ৭০০ কোটি, ইরাকে ৬০০ কোটি, কাতারে ৬০০ কোটি, জাপানে ১৫০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০০ কোটি এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আরও শত শত কোটি ডলার আটকে আছে।

অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের অবমূল্যায়নের মধ্যে এই বিপুল অর্থ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পদ মুক্ত হলে দেশটির তেল আয়ের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন জটিলতাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102