ইরানের অবরোধ করে রাখা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) তোলা একটি প্রস্তাব গত শনিবার ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স।
বাহরাইনের নেতৃত্বে আরব দেশগুলোর আনা এই প্রস্তাবটিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিন প্রভাবশালী দেশের বিরোধিতার মুখে এই উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা ও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালীটি বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহে এই অবরোধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাহরাইন প্রস্তাব করেছিল যে, আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীকে ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ (যা মূলত সামরিক পদক্ষেপের সংকেত) নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। তবে রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স এই সামরিক পন্থার তীব্র বিরোধিতা করে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই পদক্ষেপকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC)-এর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে, যা গোটা অঞ্চলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
প্রণালীটি বন্ধ করার পর থেকে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হাজার হাজার পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি এই হামলাগুলোকে ‘পরিকল্পিত ও আগ্রাসী’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো আগে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিশর পরিস্থিতি শান্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে সৌদি আরব ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সাগের মনে করেন, কোনো যুদ্ধবিরতি সম্ভব নয় যতক্ষণ না ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা এবং এই প্রণালীর ওপর তাদের একক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করা যাচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিষদে এই অচলাবস্থার কারণে অদূর ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার কোনো কূটনৈতিক সমাধান দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে, অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি ও সারের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।