রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন

বৃষ্টি-রোদে ক্ষয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটার ঐতিহাসিক পালতোলা নৌকা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় সন্ধান পাওয়া আড়াইশ বছরের পুরোনো পালতোলা নৌকাটি গত ১২ বছরেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদে শুকিয়ে নৌকাটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে এটি দেখতে আসা পর্যটকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রাচীন এ নৌকাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি একটি জাদুঘর নির্মাণ করা হোক। রাখাইন সম্প্রদায়ের মতে, নৌকাটি সংরক্ষণ না করা হলে তাদের পূর্বপুরুষদের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও হারিয়ে যাবে। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জানিয়েছে, নৌকাটি সংরক্ষণের জন্য কাজ চলছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, ২০১৩ সালে সমুদ্রসৈকতের অব্যাহত ভাঙনে বালুর নিচ থেকে ৭২ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৪ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ৯০ টন ওজনের কাঠের তৈরি এ নৌকাটি ভেসে ওঠে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কারিগরি সহায়তায় এবং বাংলাদেশ রেলওয়েকে সম্পৃক্ত করে ২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রেললাইনের মাধ্যমে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের পূর্ব পাশে এটি স্থাপন করা হয়।

ধারণা করা হয়, আড়াইশ বছরেরও আগে রাখাইনরা এই নৌকায় চড়ে কুয়াকাটায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কালের বিবর্তনে তাদের অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নৌকাটি এখনো এ অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদে শুকিয়ে কাঠের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া তামার পেরেক, নারিকেলের মালা, নারিকেলের ছোবলা দিয়ে তৈরি রশি, ভাঙা মৃৎপাত্রের টুকরো, ধানের চিটা, পাটকাঠি, মাদুরের অবশেষ, পাটের ছালার নিদর্শন এবং লোহার ভারী শিকল বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। নৌকাটির গায়ে কাঠের বাতা, স্টিলের পাত ও রং ব্যবহার করা হয়েছে। পিতলের প্রলেপ থাকার কারণে অনেকে একে ‘সোনার নৌকা’ বলেও উল্লেখ করেন।

স্থানীয় রাখাইনদের তথ্যমতে, প্রায় ২২৫ বছর আগে বার্মার আরাকান রাজ্য থেকে জাতিগত দ্বন্দ্বের কারণে ১৫০টি পরিবার ৫০টি কাঠের নৌকায় করে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় এসে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করেন। বর্তমানে সংরক্ষিত এ নৌকাটি দেখতে নিয়মিত পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।l

পিরোজপুর থেকে আসা পর্যটক হাসান মামুন বলেন, ‘নৌকাটি এ অঞ্চলের রাখাইনদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। এটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।’

আরেক পর্যটক নাদিরা পারভীন বলেন, ‘কুয়াকাটায় ঘুরতে এসে নৌকাটির কথা শুনে দেখতে এলাম। এত পুরোনো একটি নৌকা এভাবে অযত্নে না রেখে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা উচিত।’

কুয়াকাটা শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ ইন্দ্রোং বংশ ভিক্ষু বলেন, ‘নৌকাটি আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি। এটি রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। সংরক্ষণ না করলে আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’

কুয়াকাটা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির বলেন, একটি জাদুঘর নির্মাণ করে রাখাইনদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত এ প্রাচীন পালতোলা নৌকাটি সংরক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী নৌকা সংগ্রহ করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলে দূর-দূরান্ত থেকে আরও পর্যটক আকৃষ্ট হবে।

বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান মো. আতিকুর রহমান জানান, প্রাচীন এ নৌকাটি সংরক্ষণের কাজ চলমান। কাঠের তৈরি নিদর্শন দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের পাশাপাশি কুয়াকাটায় একটি আধুনিক জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটার উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শনগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102