দায়িত্বগ্রহণের প্রথম চার মাসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ২২৫টি কাজ ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত ‘ডাকসুর চার মাস: কার্যবিবরণী ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কাজ ও উদ্যোগের বিবরণী তুলে ধরেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ।
সংবাদ সম্মেলনে ‘দায়িত্বগ্রহণের প্রথম চার মাসে ডাকসুর কার্যক্রমের বিররণী’ ও ‘প্রতিনিধি সম্মেলন ২০২৫’ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়৷
ডাকসু জিএস বলেন, ফলাফল ঘোষণার দিন আমরা বলেছিলাম আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের কাজের জবাবদিহি করব। তার ধারাবাহিকতায় গত ডিসেম্বরে আমরা দুই মাসের কাজগুলো জানিয়েছিলাম। আজকে চার মাসের কাজ ও উদ্যোগের বিবরণী সকলের কাছে তুলে ধরছি। যদি শিক্ষার্থীদের মনে হয় আমরা কোনো কাজ করিনি আমাদের জানালে আমরা সেটি নিয়ে অবশ্যই কাজ করব।
ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বাজেটের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্তরে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা চায় না শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর থাকুক, চায় না স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠিত হোক।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, নানাভাবে কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তবুও আমরা বাজেটের অজুহাতে বসে থাকিনি। আজ আমরা চাইলে বলতে পারতাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফান্ড পাইনি, তাই কাজ করতে পারিনি। কিন্তু আমরা সেই পথ বেছে নিইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই, দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে থাকা রিসোর্স পারসন এবং দাতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা কাজ এগিয়ে নিয়েছি।’
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা গত চার মাসে ডাকসুর কাজের মধ্যে রয়েছে:
ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করতে রেজুলেশন আকারে প্রস্তাব পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট পাঠানো, শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদের এখতিয়ার বহির্ভূত রেজুলেশন বাতিল, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে এয়ারকন্ডিশনসহ জরুরি সংস্কার কাজ, ১৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার ছাত্রী হল নির্মাণ দ্রুততর করার লক্ষ্যে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে দফায় দফায় আলোচনা, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৮০০ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যৌথভাবে কাজ করা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৫টি হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সম্মতি আদায়, ছাত্রীদের জন্য কার্জন হলের কমনরুমে নির্ধারিত স্থান ও মসজিদ সংস্কারের কাজ শুরু করা, কমনরুমসমূহ ও টিএসসির নামাজের স্থানে নতুন কার্পেট প্রদান, ডাকসুর ওয়েবসাইট চালু, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ১০টি এয়ার কন্ডিশনার ও এক্স-রে মেশিন-ইসিজি মেশিন-এনালাইজার-মাইক্রোস্কোপসহ মেডিকেল সেন্টার সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা, ৫০% ছাড়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের সাথে MoU স্বাক্ষর করা, ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা, হল ভিত্তিক মোট ১৮ বার ছারপোকার ঔষধ দেওয়া৷
তাছাড়া, একাডেমিক এরিয়া-সহ ছাত্রী হলসমূহে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, সোচ্চার-এর সাথে যৌথ উদ্যোগে Serenity Session: Breathe & Bloom শীর্ষক ইন্টারাক্টিভ সেশন আয়োজন করা, সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে Breast Cancer Awareness শীর্ষক সেমিনার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সহযোগিতায় দুটি মেডিকেল ক্যাম্পে প্রায় ৩০০০ শিক্ষার্থীকে সেবা, বারডেম হাসপাতালের সহযোগিতায় শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বল্পখরচে ব্রেস্ট ক্যান্সার চেকআপের সুযোগ প্রদান।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ডাকসু সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিজয় কুইজ প্রতিযোগিতা, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্মরণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুনির চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার শীর্ষক স্মরণিকার জন্য লেখা আহ্বান, ‘বিজয়ের রঙতুলি’ শীর্ষক আলপনা উৎসব, বিজয় দিবসে ‘বিজয় সাইকেল র্যালি ও স্ট্যান্ট শো’ আয়োজন, ‘যুদ্ধ দিনের গল্প শুনি’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান, ‘বিজয়ের কথা’ শীর্ষক প্রকাশনার জন্য লেখা আহ্বান, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে৷ এ ছাড়া ডাকসু সীরাতুন্নবী (সা.) সন্ধ্যা ও সীরাত প্রতিযোগিতা, নবান্ন উৎসব, নাট্যোৎসবসহ কয়েকটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এ ছাড়া গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য চারটি সেমিনার আয়োজন, ৭টি প্রসিদ্ধ জার্নালে ফ্রি অ্যাক্সেসের ব্যবস্থা করা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আলো স্বল্পতা দূর করতে লাইটিং ও বিজ্ঞান লাইব্রেরিতে নতুন ফ্যান সংযোজন করা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পরীক্ষার হল বরাদ্দ প্রথা বাতিল করা, শিক্ষার্থীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য সফট স্কিল প্রশিক্ষণের আয়োজন, ৪টি প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপ আয়োজন, স্পোকেন ইংলিশের ৪টি কোর্স চালু করা, বিভিন্ন সেক্টরের প্রফেশনালস এবং শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ স্কিল সামিট আয়োজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ২৯টি ই-রিসোর্স সাবস্ক্রাইবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডাকসুর উদ্যোগে বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট ও রেঞ্জার সদস্যদের অংশগ্রহণে দুই দিনব্যাপী ‘Firefighting, Search & Rescue, First Aid and Earthquake Management Training’, ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ চালু, ১৮ টি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ক ১৮ টি প্রশিক্ষণ, দুটি ইনস্টিটিউট এবং তিনটি ছাত্রী হলে মোট পাঁচটি সেলফ ডিফেন্স প্রশিক্ষণ, ছাত্রীদের জন্য পৃথক জিমনেসিয়াম নির্মাণের কাজ শুরু, ১৮ হলে ৩৬ বার পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মসূচি, DURC-এর সহ-উদ্যোগে ১০ কিমি রান সম্পন্ন করা, COP-30 জাতিসংঘ সম্মেলন উপলক্ষে ঢাবি টু জাবি সাইকেল র্যালি আয়োজন উল্লেখযোগ্য।
পরিবহন খাতে জরাজীর্ণ বাস পরিবর্তন এবং ট্রিপ ও সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রায় দুই কোটি টাকার বাজেটের ব্যবস্থা, সকল রুটে সান্ধ্যকালীন বাস ট্রিপ চালু, ১৯টি ইলেকট্রিক শাটল চালু, সব ছাত্রী হলকে ক্যাম্পাস শাটলের আওতাভুক্ত, ক্ষণিকা রুটের বাসগুলোর এক্সপ্রেসওয়ে টোল ফ্রি করা।